রাফি আহাম্মেদ উল্লাসের গল্প ‘রিকশাওয়ালা শফিক’

Spread the love

খোলা ডেস্কঃ

শিরোনামে ‘গল্প’ বলা হলেও ঘটনাটা সত্যি ! অনেকের জন্য ব্যাপারটা অনুপ্রেরণার হতে পারে, ভেবেই প্রকাশ করা। ছোট্ট এই গল্পটা বেশ আলোচিত হয়ে ফেসবুকের হোমপেজে ঘুরছে গত কদিন ধরেই। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, কেউকেউ  শুভকামনা জানিয়েছেন আর কেউ লিখেছেন, এখনো রিক্সায় উঠলে মনে মনে খুজে ফিরি সেই ‘রিক্সাওয়ালা শফিক’ কে ।

কখনো যদি আপনার সাথেও তার দেখা হয়ে যায় ব্যস্ত রজধানীর কোন রাস্তায়, জেনে নিতে পারেন আরও অনেক অজানা গল্প !

বনশ্রী যাবেন ?
বনশ্রী তো চিনিনা , চিনায়া নিয়েন , নতুন জায়গা না গেলে আর চিনমু ক্যামনে !
খাটি কথা ।

টিএসসির মোর থেকে যখন রিকশা ঠিক করি তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ঢাকা শহর , বাড়ি ফেরার তাড়া , তাই অচিন রিকশাওয়ালাই সই । প্রত্যেক মোরে ডান বাম বলতে বলতে চলার পথের অবিন্যস্ত আলসেমি , অহেতুক সব চিন্তা ভাবনার বিলাসিতা কেটে যাব , যাক ! রাতের ঢাকা এখন আর খুব নিরাপদ না , চারদেয়ালে ফেরা দরকার । ঘরে ফেরা দরকার ।

শাহজান পুর এসে ভদ্রলোক ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি কিনা জিজ্ঞেস করলেন ।
বললাম পড়িনা । ডাক্তারি করি ।
দেশেই থাকবেন , না বিদেশ চইলা যাবেন , বিনীত জিজ্ঞাসা তার ।
বললাম দেশেই থাকবো , অর্ধেক জিবন শেষ , নতুন করে আর কৈ যাবো !

দেশের অবস্থা তো ভালো না , মানুষ জন ভালো না , শিক্ষা নাই , সচেতনতা নাই , থাইকা কি করবেন … তার গলায় আক্ষেপ এইবার !

আমি এইবার বিষ্মিত হলাম , রিকশাওয়ালার গলায় এই ধরনের সূক্ষ রুচিশীল হাহাকার তো থাকার কথা না , সামথিং ইজ নট রাইট ! সত্যিকার অর্থেই নড়েচড়ে বসলাম । আলো অন্ধকারে কেবল ঘামে ভেজা পিঠটুকু দেখা যাচ্ছে তার । ওঠার সময় চেহারা খেয়ালই করি নি ! সস্তা শার্টে লেপ্টে থাকা পিঠ থেকে কোন এবনর্মাল কিছু উদ্ধার করা গেলো না !

এই দেশের মেইন সমস্যা কি ভাই জানেন ?
আমি জিজ্ঞেস করলাম কি ? ( সমস্যা তো অনেক । ঘুষ, দুই নম্বরি , বিচার না হওয়া, প্রভাবশালী দের যা ইচ্ছা তাই করা , ধর্ম ইউজ করে হাবিজাবি কাজ করা , একে তাকে রাজাকার, একে তাকে নাস্তিক বানানো , বাজে রাজনীতি , তার মতে কোনটা কে জানে ! )

ভদ্রলোকের উত্তর শুনে ভিমরি খেলাম ।
মেইন সমস্যা হচ্ছে কেউ বই পড়ে না ।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি পড়েন ?
অত না , টুকটাক । আমি আবার কবিতার বই একটু বেশি পড়ি ।
বলেন কি ! বিষ্ময়ে রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হয় আমার !

কার কবিতার বই পড়েন ?
ভদ্রলোক প্রবল মমতায় জানায় তার পছন্দের কবি শক্তি চট্টপধ্যায় আর ফরাসী কবি আর্তুর র‍্যাবো !

খিলগার গলিতে আকাশ ফুড়ে হঠাত একটা পাহাড় সম উঁচু জ্বিন এসে যদি পথ রোধ করে দাড়াতো তবু এত চমকাতাম না !
আর্তুর র‍্যাবো , শক্তি !
কি বিষ্ময় ! কি বিষ্ময় !

ভদ্রলোকের নাম শ্রিপান্থ শফিক । ( শ্রিপান্থ টুক বানানো , আপনার অনুমান ঠিক আছে , বরিশাল এর একেবারে ভীতর থেকে উঠা আসা একটা মানুষ কে ঐটুক মেলোড্রামা করতে দেয়াই যায় ) । ছাত্র খারাপ ছিলেন না । ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর কবিতার ভুতে ধরলো । আরজ আলী মাতুব্বর, সক্রেটস , স্টিফেন হকিং , শক্তি, র‍্যাবো , গিয়ম এপোলোনিয়ার, হুমায়ুন আজাদ, পড়ে টরে তার মনে হল জীবন এক আশ্চর্য গিফট ।
স্কুল কলেজে পড়ে সেইটা নষ্ট করার কোন মানে হয় না !
আর পড়েন নি ।

কবিতা লেখেন নিয়মিত । দুইটা বই ও বেরিয়েছে !

যে জীবন তিনি যাপন করেন , তার মতে এটা প্রথা বিরোধী জীবন ।
একটা সেন্স অফ ফ্রিডম তো আছে ! খারাপ কি !

বাসার কাছাকাছি এসে ভদ্রলোকের সাথে কফি খেলাম এক কাপ ।
কফি খেতে খেতে মনে হল ,
আহা জীবন ! কেউ কি ভীষণ দুঃসাহস নিয়ে জন্মায়!
আর কেউ কি করুণ ভাবে মাথা নত করে মেনে নেয় জাগতিক সমস্ত হিসাব !

ভদ্রলোকের প্রতি এক বুক ভর্তি হিংসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

রাফি আহাম্মেদ উল্লাস গল্পটি লিখেছেন।  তিনি রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •